ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বিলের দেশীয় মাছ বিলুপ্তের পথে
মোঃখলিলুর রহমান খলিলঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী ও প্লাবনভূমির জন্য পরিচিত। এখানে কোনো বড় হাওড় না থাকলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী ও মৌসুমি জলাভূমি রয়েছে।নবীনগরের মেঘনা, তিতাস, বুড়ি ও পাগলা নদী প্রবাহিত হয়েছে। বর্ষার সময়ে সমগ্র নবীনগর এলাকা পানিতে থৈ থৈ করতো,নবীনগরের প্রতিটি হাট বাজারে বর্ষায় সময় দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো।
নবীনগর অঞ্চলের ৬৪ প্রকার দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলছে। এক সময়ে এ উপজেলার দেশীয় মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে জাতীয় পর্যায়ের বাজার- বন্দরে বাজারজাতসহ পর্যাপ্ত মাছ বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এখন আর তা হয় না বললেই চলে। মাছের দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্যতায় এ উপজেলার সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিসাধনে ব্যর্থ হচ্ছে।
খামারের মাছই এখন বাজারগুলো দখল করে ফেলেছে। অভিজ্ঞ জেলে ও গণ্যমান্য লোকজনের ভাষ্য, এ উপজেলা থেকে ৬৪ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। ইতিমধ্যে বর্ষায় মৎস্য অধিদপ্তর থেকে দুই দফায় মাছ ছাড়া হলেও কোনো প্রতিকার দেখা যায় না।
একসময়ের জেলার মৎস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত অগণিত নদী, নদ-নদী, বিলে পরিপূর্ণ ছিল। মিঠা পানিতে পরিপূর্ণ এ উপজেলায় প্রায় ২৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। মাছের জন্য সুপ্রসিদ্ধ এ উপজেলায় দেশ-বিদেশের লোকজন এসে মাছ শিকার এবং মাছের তৈরি সুস্বাদু খাবার খেয়ে পরিবারের লোকজনের জন্য মাছ নিয়ে যেত। কিন্তু এখন আর তা নেই।
নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস, খাল-বিল ভরাট করে কৃষিক্ষেত অথবা বাড়িঘর তৈরি, জলমহালগুলোতে ইজারাদারদের স্বেচ্ছাচারিতা, মাছের অভয় আশ্রয়স্থলের পার্শ্ববর্তী জমিতে কীটনাশকের ব্যবহারে মৎস্যসম্পদ উজাড় হয়ে গেছে।
এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ সৃষ্টি করে মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টি, সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিষ প্রয়োগে পাটি বাঁধে ও বিলের পানি সেচের মাধ্যমে মাছ আহরণ, কারেন্ট জাল, মশারি জালে রেনুপোনা ও মাছ ধরার কারণে এ অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং বিলুপ্ত হতে চলছে। বিলুপ্ত হওয়া প্রধান মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে নান্দীদ মাছ, , বাতাসী মাছ, গুং মাছ, রানী মাছ, পান মাছ, মৃগা মাছ, রিডা মাছ, বৈচা মাছ, কানলা মাছ, বামট মাছ, পাপদা মাছ, চেং মাছ, বাঘাইর মাছ, বেংরা মাছ, সিলুন মাছ, খল্লা মাছ, লাচ মাছ, এলগন মাছ, রামচেলা মাছ, গিলাকানি, নাপিত মাছ গলদা চিংড়ি সহ অসংখ্য মাছ। এ ছাড়া বিলুপ্তির পথে প্রধান মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে ইলিশ মাছ, মলা মাছ, রুই মাছ, কাতলা মাছ, বজরী মাছ, হালনী মাছ, ডান কানা মাছ, গুতুম মাছ, স্বরপুটি মাছ, চান্দা মাছ, ডিমা চিংড়ী, বাইম মাছ ও মেনি মাছ।
নবীনগর উপজেলার বাইশমোজা,কৃষ্ণনগর,নবীপুর,গোপালপুর, মানিকনগর, সলিমগঞ্জ সলিম,শ্যামগ্রাম,বড়িকান্দি, শিবপুর, বিটঘর, ভাঙরা,ইব্রাহিমপুর নবীনগর সদর বাজার ও ইত্যাদি বাজার-হাট ঘুরে দেখা গেছে, খামারের মাছ দিয়েই বাজার ভরপুর। নদী ও বিলে দেশীয় প্রজাতির মাছ মাঝে মধ্যে পাওয়া গেলেও এগুলোর দাম অত্যন্ত চড়া এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
খামারের মাছের দাম আনুপাতিক হারে কম। এ ব্যাপারে একাধিক মাছ বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা জানান, দেশীয় প্রজাতির মাছ খুবই কম পাওয়া যায় এবং দাম বেশি। এ ছাড়া ফড়িয়া-ব্যবসায়ীরা নদী ও বিল থেকে এগুলো কিনে ভৈরব, আশুগঞ্জ, চালান করে দেয়। পরে রাজধানী শহর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ জাতীয় পর্যায়ের বাজারগুলোতে এ মাছ বাজারজাত করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আক্কাস আলী বলেন, নবীনগর অঞ্চল দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু কারেন্ট জাল ও নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা মাছ নিধন, জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, , দেশীয় মাছ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অবৈধ জালবিরোধী অভিযান, পোনা মাছ অবমুক্তকরণ, জেলেদের প্রশিক্ষণ এবং অভয়াশ্রম স্থাপনের মতো কর্মসূচি চলমান রয়েছে।