নবীনগরে বর্ষার সৌন্দর্য্য বিলুপ্তের পথে
মোঃ খলিলুর রহমান খলিলঃব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বর্ষার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতো চমৎকার ছিলো যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ১১৫ টি বর্ষাকাল নিয়ে গান হয়তো নবীনগরের বর্ষার সৌন্দর্য দেখে লিখেছেন বললেও ভুল হবে না।
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না…রবীন্দ্রনাথের এই গান প্রেমিকের মনে উচাটন করে তোলতো, বিরহী করে তোলতো।
নবীনগরের বর্ষাকালে প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর রুপ ধারণ করতো, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস বর্ষাকাল।অথচ বর্ষা কখন আসে কখন যায় বর্তমান প্রজন্ম বুঝতেই পারে না।বর্ষায় নবীনগরের ২১৭ টি গ্রামে ২১ টি ইউনিয়নে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিলো নৌকা। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনেক উৎসবের আয়োজন করা হতো বর্ষাকালে নৌপথের সুবিধার কারণে।নবীনগরের কাইতলা, বিটঘর শিবপুর, বিদ্যাকোট, নাটঘর, বড়াইল,কৃষ্ণ নগর, বীরগাও, শ্যামগ্রাম, সলিমগঞ্জ, বড়িকান্দি, সাতমোড়া, শ্যামগ্রাম রসুল্লাবাদ রতনপুর ও নবীনগর পূর্ব ও পশ্চিম ইউনিয়নের গ্রাম গুলো থেকে নবীনগর সদরে মূলত বর্ষাকালে যোগাযোগ ছিলো সহজ লভ্য। বর্ষাকালে খাল বিল, তিতাস, বোড়ি, বৌধূন্তী, পাগলা, যপনা ও মেঘনা নদীতে পাল তুলা নৌকা দেখা যেতো,বিলের মধ্যে শাপলা, পদ্ন ফুটতো,দেশি মাছ সস্তায় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো।বাউচা ধান ফলানো হতো বর্ষায় । বর্ষাকালে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। তীব্র গরমের পর বর্ষার ঠান্ডা বাতাস ও বৃষ্টি সবার মনে শান্তি এনে দেয় এটাই ছিলো বর্ষার বৈশিষ্ট্য, সময়ের সাথে সাথে বর্ষাকালের সৌন্দর্যও লোপ পেয়েছে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায়, বর্ষাকালে ঠিক আগের মতো পানি না হওয়ায় নৌ-পথ প্রায় বিলুপ্ত বললেও ভুল হবে না গ্রীষ্মের গরমের পর বর্ষার আগমন ঘটলে নতুন বউ নৌকা দিয়ে নাইউর যেতো
উকিল মুন্সির বিখ্যাত গান আষাঢ় মাসের ভাসা পানিরে কেড়াই নৌকার মাঝিদের কন্ঠে শুনতে পাওয়া যেতো।
প্রকৃতির রূপচারদিক সবুজ রঙে ভরে যেতো ।নদী, খাল ও বিল জলে ভরে ওঠে।কদম ফুল ফোটতো রাস্তায় রাস্তায় ।নতুন প্রাণের সঞ্চার হতো প্রকৃতিতে।কৃষিকাজে এই সময়ে ধান পাট ও অন্যান্য ফসল বোনতো।বৃষ্টি ফসলের ক্ষেতকে বাঁচিয়ে রাখতো ।মাটির নিচের পানির স্তর ঠিক থাকতো।পুকুর ও নদীগুলো পানিতে পূর্ণ হতো। বর্ষার থৈ থৈ পানিতে কিশোরদের রায় খেলা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা।কিশোরদের এই রায় খেলা দেখেই কিন্তু রবী ঠাকুর বিখ্যাত ছুটি গল্প লিখেছিলেন তবে নবীনগরের কিশোরদের দেখে না কুষ্ঠিয়ার কিশোদের দেখে।র্বৃষ্টির কারণে অনেক সময় বন্যা হয়ে সমস্যাও হতো তবে যে বছর বন্যা হতো সে বছর আবার ফসল ভালো হতো।।নিচু জায়গায় পানি জমে চলাচলে কষ্ট হতো বাড়ীর চিপাচাপা দিয়ে পায়ে হাটার মাটির রাস্তা ছিলো,প্রচুর বৃষ্টি হতো রাস্তাঘাটও নষ্ট হতো।
বর্ষাকালে গ্রামের মহিলারা নকশিকাঁথা নিয়ে বসতো,টানা সাতদিন বৃষ্টি হতো, কেউ ইচ্ছে করলেই ঘর থেকে বের হতে পারতো না,স্কুলের শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে বাড়ীতে বসে বিভিন্ন ধরনের খেলায় মেতে উঠতো।
কেয়া, কামিনী, হিজল, বকুল, জারুল, করবী ও সোনালু এসবও বর্ষা ঋতুতে ফুটে থাকতে দেখা যেতো। আর জুঁই-চামেলিকে বাদ দেবার কোন সুযোগ ছিলোনা । তবে বর্ষার প্রধান ফুল হল কদম। বৃষ্টিভেজা কদমের মনকাড়া সৌরভ ভিজে বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রকৃতিতে। অবশ্য এ দৃশ্য নবীনগরের গ্রামে এখনো চোখে পড়ে।
গ্রামের এক গ্রামের সাথে আরেক গ্রামের ফুটবল খেলার আয়োজন হতো, নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা হতো,নৌকা শিল্পের জন্য বিখ্যাত আলমনগর ও লাপাং গ্রামে রাতদিন নৌকা তৈরির আওয়াজ পাওয়া যেতো।
মানব মনে বর্ষার প্রভাব অপরিসীম। বর্ষা নবীনগরের মানুষের মনকে করে তোলতো সহজ, সরল ও সৃষ্টিশীল। বর্ষা হৃদয় ও মনে আনতো অফুরন্ত আবেগ।
নবীনগরের বিল গুলোতে বর্ষায় মাছ নেই,শাপলা ফুল নেই, পালতোলা নৌকা নেই,দ্বীপের মতো ভেসে থাকা গ্রাম নেই,হিজল বাগান নেই, খালের উপরে সাঁকো আগের মতো নেই,ঘাটে ঘাটে বর্ষার পানিও নেই। সর্বোপরি সময়ের কাছে, সভ্যতা ও প্রযুক্তির কাছে, বৈশ্বিক প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কাছে হার মেনেছে। বর্ষার সৌন্দর্য নবীনগরে বিলুপ্তেরপথে।