শৈশবের স্মৃতি বিবর্ণ হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম!
মোঃখলিলুর রহমান (খলিল পরদেশী): একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তরুন প্রজন্মে ছিলো নেটওয়ার্ক ইকোনমিক সিটির বাহিরে।
বিংশ শতকের আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ বছর (১৯৭০ টু ২০০০) পর্যন্ত জীবন যাত্রার মান ছিলো এক দশক থেকে আরেক দশকে ঊনিশ বিশ।কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে অদ্যাবধি জীবন যাত্রার মান ঊনবিংশ শতাব্দীর তুলনায় আকাশপাতাল পার্থক্য হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী ছিলো এক কথায় যাকে বলে একদম সহজসরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত, বিদ্যুৎ ছিলো তবে খুব নড়বড়ে। এই আসে এই যায়।বাড়ির আসেপাশে এতো লাগাতারে বাড়ি ঘর ছিলো না,ডোবা গাছপালা, বন জঙ্গল ছিলো। ছেলেমেয়েরা ডানপিটে দুরন্ত ছিলো।লেখা পড়ার তেমন প্রতিযোগিতা ছিলো না।কিন্তু নতুন বই পেলে দুইটা কাজ খুব ভালো পড়তো, সিমেন্ট মাটির বস্তা কেটে বইয়ের মলাট লাগানো হতো,আর বাংলা বইয়ের সুন্দর দৃশ্যগুলো কালার পেন্সিল দিয়ে রং করা হতো। বিনোদনের সর্বোচ্চ মাধ্যম ছিলো সিনেমা হল।।গ্রামের কিশোদের বিনোদন ছিলো মাঝে মাঝে সবার বাড়ি থেকে এটা সেটা নিয়ে এসে সবাই একত্রে ঝোলাভাতি খেলা,দাঁড়িয়াবান্ধা, বৌচি,গোল্লাছুট খেলা।
বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরে ঘরে হারিকেন, বা কুপি বাতি জ্বলতো।খুব বড়লোক যারা তাদের বাড়ি দাবা কিংবা ক্যারামবোর্ড ছিলো ও রঙিন বা সাদা কালো টেলিভিশন ছিলো। সাদাকালো টেলিভিশনে কাঠের একটা বক্স থাকতো, সেটাতে ভরে তালা দিয়ে রাখতো।কোন প্রোগ্রাম হলে।সেই টেলিভিশনের সামনে মাটিতে কিছু বিছিয়ে বসে পড়তো কখন সেই স্বপ্নের টিভির দরজাটা খুলবে, টিপু সুলতান, মোগল আজম,দাতা হাতেম তাই,হারকিউলিক্স,আলিফ -লায়লা,এসব বিদেশি সিরিয়াল গুলো দেখতো কিযে আনন্দ ।সপ্তাহে একদিন এ সব প্রোগ্রাম হতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতো,কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত আনন্দ দায়ক রুপ কাহিনীতে দেখার সময় অনেক সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হলে অপেক্ষার পালা শুরু হতো,ইতিমধ্যে বড় ভাইয়েরা, চাঁদা তুলে ব্যাটারি ভাড়া করতে চলে যেতো।তারা ব্যাটারি আনতে দেড়ি ফিট্ করতে দেড়ি নেই।
বিটিভিতে রাতে দশটার ইংরেজি খবরের পর ছায়াছন্দ নামের সিনেমার গান হতো,সেটা আবার খুব ভীষণ প্রিয় ছিলো কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের নিকট
তারপর বের হলো ভিসিয়ার,ক্যাসেট। ওরে তরুন প্রজন্মের আনন্দ কে দেখে,মাঝে মাঝে চাঁদা তুলে ভাড়া আনা হতো ভিসিয়ার।সব ইন্ডিয়া বাংলা, হিন্দি ছবি।
টিভিটা বাড়ির বারান্দায় রাখা হতো।ছালা বিছিয়ে বা পাটি বিছিয়ে অনেক মানুষ বসে দেখতো।সারা রাত অমিতাভ, রেখা,শ্রীদেবী ছবি দেখতো। রঙিন রুব্বান,বেদের মেয়ে জোস্না,সিরাজ উদ্দোল্লাহ, সাত ভাই চম্মা, ওরা এগারো জন,স্বপ্নের ঠিকানার মতো সুপার হিট মুভি ছিলো ১৯৭০ থেকে ২০০০ সালে।
বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে শিক্ষার্থীরা চলে যেতো মামার বাড়ীতে,মামার বাড়ীর কত স্মৃতি নিয়ে বড়ো হয়েছে আগেরকার প্রজন্ম, কিশোররা কলমী বন্ধুর নিকট চিঠি লিখতো,ডাকটিকিট শখের বসে সংগ্রহ করতো।বিকাল বেলা এক পাড়ার সাথে আরেক পাড়ার ফুটবল, হাডুডু খেলা হতো,নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা হতো,পুথির পাঠ হতো উঠানে উঠানে,গ্রামে বিভিন্ন উৎসবে মেলা হতো,মেলায় পুতুল নাচ দেখানো হতো,নাগারদুলা বসতো,বায়স্কোপ দেখানো হতো।এক
বিংশ শতকের শুরুতে বিশেষ করে ২০০৭ সাল থেকে দেশের প্রযুক্তিতে মোবাইল সংযোগ হলে শিক্ষার্থীর শৈশবের স্মৃতিমধুর খেলাধুলা ও কর্মকাণ্ড থেকে দূরে চলে আসে। তাদের নিকট গ্রামের নৌকা বাইচ,টেলিভিশনের আলিফ লায়লার কথা বললে মিথ্যা মনে করে। তাদের নিকট মামার বাড়ীতে বেড়ানোর কোন স্মৃতি নেই,শৈশবের বন্ধুদের তালিকা নেই,মোবাইল ফোন দুই শতক অর্থাৎ ২০০০ সালের আগের ত্রিশ বছর ও বর্তমানের বিশ বছরের মধ্যে ১০০ বছরের ব্যবধান করেছে বললেও ভুল হবে না।