ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: বহুভাষার পরম তীর্থযাত্রী-এর মৃত্যু বার্ষিকীতে স্মরণ করছি তাঁর জীবন ও কর্ম।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের প্রতিভা, মেধা এবং নিরলস সাধনার মাধ্যমে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন। এইসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯)। তিনি শুধু একজন ভাষাবিদই নন, বরং একাধারে সাহিত্যিক, গবেষক, দার্শনিক, অনুবাদক ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও বাংলা সমাজে সুপরিচিত। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনে এক অনবদ্য অবদান রেখেছে, যার ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পায়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মুন্সী আব্দুল্লাহ। পিতা ছিলেন একজন মৌলভী, যিনি ইসলামিক শিক্ষায় অভিজ্ঞ ছিলেন এবং নিজ গ্রামেই ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ করতেন। ছোটবেলা থেকেই শহীদুল্লাহ একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পারিবারিক আবহে আরবি ও ফারসি ভাষার প্রতি আগ্রহ জন্মে, যা পরবর্তীতে তাঁকে বহুভাষাবিদের উচ্চাসনে পৌঁছে দেয়। তিনি খুবই কৌতূহলী ও জিজ্ঞাসু ছিলেন এবং নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ তাঁকে এক বিশাল পাণ্ডিত্যের দিকে ধাবিত করেছিল।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-এর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় নিজ গ্রামের পাঠশালায়। এরপর তিনি হুগলি মাদ্রাসা থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই বিএ এবং এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এমএ-তে তিনি সংস্কৃত সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে এই কৃতিত্ব তৎকালীন সময়ে একটি ব্যতিক্রমী ও যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। উচ্চশিক্ষা অর্জনের বাসনা নিয়ে তিনি প্যারিসে পাড়ি জমান এবং সেখানে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “সন্দর্ভে চর্যাপদ”, যা বাংলা সাহিত্যের আদিকাব্য হিসেবে পরিচিত। চর্যাপদ নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হয়। চর্যাপদের ভাষা, ছন্দ, ভাব ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বাংলা সাহিত্যের উৎস সন্ধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি প্রমাণ করেন যে চর্যাপদে ব্যবহৃত ভাষা প্রাচীন বাংলা এবং এটি বাংলা ভাষার আদিরূপ বহন করে। তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষার গঠনতত্ত্ব, ধ্বনিতত্ত্ব ও ব্যাকরণ নির্মাণে বিশাল অবদান রাখে। চর্যাপদের শব্দ ও ভাব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, তা আজও অনুসরণীয় ও প্রামাণ্য বিবেচিত হয়।
ডক্টর শহীদুল্লাহর ভাষাজ্ঞান ছিল বিস্ময়কর। তিনি মোট ২৬টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাষাগুলো হলো বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, ফরাসি, ইংরেজি, তুর্কি ও পশতু। তিনি ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; ভাষার ভেতর তিনি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চেতনার গভীর অভিব্যক্তি উপলব্ধি করতেন। তাঁর মতে, ভাষা মানুষের আত্মার পরিচয় বহন করে। ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন ও ব্যবহার নিয়ে তিনি বহু প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র রচনা করেন, যেগুলো আজও ভাষাতাত্ত্বিকদের জন্য মূল্যবান সম্পদ। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান বহুমাত্রিক। তিনি বহু অনুবাদ কর্মে অংশগ্রহণ করেছেন। আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত সাহিত্য থেকে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলায় অনুবাদ করেছেন, যার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁর অনুবাদিত ‘গীতগোবিন্দ’ ও ‘কুরআনের অনুবাদ’ বাংলা ভাষায় নব দিগন্ত উন্মোচন করে। বিশেষত কুরআনের অনুবাদে তিনি কেবল অর্থানুবাদ করেননি, বরং অনুধ্যানের মাধ্যমে শব্দের আধ্যাত্মিক ও ব্যাকরণিক ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেন। তাঁর এই অনুবাদ ধর্মীয় পাঠকদের পাশাপাশি গবেষকদের কাছেও এক অপরিসীম সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডক্টর শহীদুল্লাহ ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন এই বিভাগের প্রথম মুসলমান অধ্যাপক। পরবর্তীতে তিনি আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগেরও শিক্ষক হন। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের মনে গবেষণার আগ্রহ সঞ্চার করতেন। তাঁর পাঠদান ছিল যেমন তথ্যবহুল, তেমনি হৃদয়স্পর্শী। তিনি ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক পড়ানোর বাইরেও নিজস্ব পাঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে খ্যাতনামা ভাষাবিদ ও গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। প্যারিস, লন্ডন, কায়রো, দিল্লি, তেহরানসহ নানা শহরে তিনি ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেছেন। তাঁর চিন্তাধারায় ছিল এক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে স্থান পেয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের সমন্বয়। তাঁর মতে, একটি জাতির উন্নয়ন ভাষার উপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘‘যে জাতি নিজের ভাষাকে ভালোবাসে না, সে কখনো স্বাধীন হতে পারে না।’’ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণাকর্ম, প্রবন্ধ এবং পাণ্ডিত্যে বাংলা ভাষার অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর লেখা “বাংলা সাহিত্যের কথা”, “বাংলা ব্যাকরণ”, “অলৌকিক ও রহস্য গল্প”, “পাকিস্তানে বাংলা ভাষার অবস্থান” ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ভাষার বিবর্তন, উপভাষার পার্থক্য, ধ্বনিতত্ত্ব ও ব্যাকরণ নিয়ে তাঁর গবেষণাগুলো বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণে এক অনিবার্য সহায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষা থেকে আধুনিক বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে।
১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ডক্টর শহীদুল্লাহ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এক বিশাল অভিভাবককে হারায়। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার, লেখনী ও শিক্ষা আজও আমাদের আলোকিত করে চলছে। একজন মানুষের জীবন কীভাবে একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির রূপ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, ডক্টর শহীদুল্লাহ তার জীবন্ত প্রমাণ। তাঁর প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাস তাঁর নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে “ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল”। এটি শুধু একটি নাম নয়; এটি একটি প্রেরণা, একটি আদর্শের প্রতীক, যা ছাত্রদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষা ও জ্ঞানের প্রতি আত্মনিবেদনের মহত্ত্ব। ডক্টর শহীদুল্লাহর মতো পণ্ডিত বাংলার ইতিহাসে বিরল। তাঁর প্রতিটি কাজেই ছিল সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের ছাপ। তিনি কেবল ভাষাবিদ ছিলেন না, ছিলেন এক জাতীয় অভিভাবক, যিনি ভাষার মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর জীবন থেকে আজও শেখার আছে অনেক কিছু আদর্শ, পরিশ্রম, আত্মনিবেদন এবং সর্বোপরি জ্ঞানের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই তাঁকে করেছে বাংলা ভাষার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।