নবীনগরে কৃষক, মাঝি ও জেলেদের শত্রু কচুরিপানা !
মোঃখলিলুর রহমান খলিলঃ নবীনগরের নদী, খাল- বিল ও জলাশয়গুলোর অনেক বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে কচুরিপানা। ছোট-মাঝারি নদীতে এখন এই পানা এমনভাবে জমাট হয়ে থাকে যে সামান্য পানিও দেখা যায় না। নদীর মাছগুলোর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে নদীতে অন্যান্য যেসব জলজ প্রাণী বেড়ে উঠত তা-ও হয় না। অনেক পাখি নদীতে ছোঁ মেরে মাছ শিকার করলেও পানা থাকলে তা সম্ভব নয়।
নবীনগর উপজেলার ছোট বড়ো নদী,খাল বিল ঘুরে দেখা গিয়েছে প্রায় সবকটি কচুরিপানা দিয়ে পরিপূর্ণ। নৌ-পথ বন্ধ হয়ে আছে।ইচ্ছে করলেই এখন যে কেউ নৌকা নিয়ে ইব্রাহিমপুর যবনা নদী দিয়ে নবীনগরের দক্ষিণাঞ্চলের সাতমোড়া, রসুলাবাদ,ও রতনপুর ইউনিয়নের গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পাবে না কচুরিপানাার কারণে।
নবীনগর এর উত্তর অঞ্চল বিশেষ করে আলমনগর, আলিয়াবাদ, কনিকাড়া, বগডহর,কৃষ্ণনগর, বীরগাঁও বড়াইল, বিদ্যাকুট ইউনিয়নের বিলগুলো নিম্নাঞ্চল হওয়ায় ধান চাষের এক ফসলি বিল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বর্ষাকালে কচুরিপানা প্রবেশ করে শুষ্ক মৌসুমেও কৃষি জমিতে থেকে যাওয়াই কৃষিকাজে জমি অনপযোগী হয়ে পড়ে। এতে করে ধান উৎপাদন প্রায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
অনেক জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কচুরিপানায় ভরে গেলে নদী থেকে মাছ ধরতেও পারেন না। এ অবস্থায় নদীতে নৌকা চলে না। নৌকা চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে নৌকার যাত্রীদের কোথাও কোথাও অনেক পথে ঘুরে যেতে হয়। ফলে কচুরিপানা এখন অনেকের জীবন-জীবিকার জন্য হুমকি। পরিবেশের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নবীনগর উপজেলায় প্রায় সব-কটি নদী ও খাল কচুরিপানার চাদরে ঢেকে গেছে।’
নবীনগরের সবকটি নদী কচুরিপানায় ভরে আছে। নবীনগরের পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর নদীর অবস্থাও তথৈবচ।
কচুরিপানা যে একটি সংকটের নাম, এটি আগে মেনে নিতে হবে। যদি নবীনগরের জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন এটাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে, তাহলে সমস্যা দূরীকরণে কোনো ব্যবস্থাই হবে না। ।
নদী,জলাশয় ও কৃষি জমির সর্বনাশকারী কচুরিপানা দূরীকরণে বৃহৎ কোনো পদক্ষেপ অতীতে নেওয়া হয় নাই । যেহেতু প্রতিবছর কচুরিপানায় নদীগুলোর ক্ষতি সাধিত হয় তাই এগুলো ধ্বংস করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। কচুরিপানার যদি কোনো বিশেষ গুণ থাকে, যাতে কচুরিপানার প্রয়োজন আছে তাহলে সেগুলো টিকিয়ে রাখতে কিংবা উৎপাদনের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমানে যেভাবে কচুরিপানার বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে এতে যদি কচুরিপানা দূর করা না যায়, তাহলে তা নদ-নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্যের ভীষণ ক্ষতির কারণ হবে। কচুরিপানা একসময় মরে পচে যায়। তখন লম্বা শিকড়যুক্ত কচুরিপানাগুলো নদীর তলদেশে পড়ে থাকে। নদী দ্রুত ভরাট করার ক্ষেত্রেও এসবের দায় আছে।
শুধু নদীতে নয় বিলেও প্রচুর কচুরিপানা আছে। বর্ষায় যখন পানি বাড়ে তখন বিলের পানি চলে যায় নদীতে। বিল থেকেও পানির স্রোতে নদীতে চলে যায় কচুরিপানা। ফলে যে জলাশয়ের সঙ্গে নদীর সংযোগ আছে, সেই জলাশয় এবং নদী উভয় স্থান থেকে এসব দূর করতে হবে। এগুলো দূর করতে সামাজিক সচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ হলে কচুরিপানা থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
কচুরিপানার ফুল মনকে রাঙিয়ে তোলে। এগুলো একটি স্থানে স্তূপ করে রাখলে সেগুলো সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জেনেছি এ ফুলের একটি অংশ রান্না করে খাওয়া যায়। উপকারের তুলনায় এর ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতায় লিখেছেন, ‘যে নদী হারায় স্রোত, চলিতে না পারে/ সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে।’
আমাদের ছোট নদীগুলোর পানির উৎস কমে যাওয়ার কারণে এগুলোতে স্রোত আর থাকে না। ফলে খুব সহজেই কচুরিপানা এসব নদীতে দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। আমরা চাই কুচরিপানামুক্ত নদী, কচুরিপানামুক্ত জলাশয়।
নবীনগর উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম লিটনের নিকট জানতে চাই তিনি বলেন, ” কচুরিপানা পরিষ্কার করতে কৃষকদের বিঘা প্রতি পাচ থেকে ছয় হাজার টাকা লেগে যায়, ফলে রবি মৌসুমে অনেক কৃষক পরিষ্কার করে আবাদে অনাগ্রহী থাকে। উপজেলা পরিষদ থেকে একটি কচুরিপানা কাটার মেশিন ক্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যদি এটি বাস্তবায়ন হয় সেক্ষেত্রে অনেক কচুরিপানা আগাম পরিষ্কার করা যাবে, এতে কৃষকদের আবাদ উপযোগী করতে অনেক ব্যয় কমে যাবে।”
নবীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আক্কাস আলী বলেন,” মৎস্য অফিসে আমাদের এই বিষয়ে কোন বাজেট নেই,সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের অনুরোধ করবো ওনারা উপজেলা অফিস থেকে যে বাজেট পায় তা থেকে যেন সামান্য পরিমান টাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য ব্যয় করেন পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও অনুরোধ করবো কচুরিপানা পরিষ্কারে এগিয়ে আসার জন্য। ”
নবীনগর নোঙর সভাপতি আবদুল বাতেন বলেন, নবীনগরের কচুরিপানা জেলে,কৃষক ও মাঝিদের জন্য অভিশাপ, কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি। “