নবীনগরে দীর্ঘ ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত!
মোঃ খলিলুর রহমান খলিলঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় পর চলতি বছরে সর্বনিম্ন শৈত্য প্রবাহ পড়েছে ।গত ডিসেম্বরের ২০ তারিখ থেকে টানা ১৫ দিন ধরে প্রকৃতিতে শীতের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পনের দিনে নবীনগরের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৩.৩৩ সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১২.২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা গত বিশ বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডের তুলনায় কম। শীতের আগমন বৈচিত্র্যময় হলেও টানা তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় শীতের যে প্রকৃত আনন্দ ভোগ করার কথা তা ভোগ করতে পারছে না নবীনগর বাসী। , পৌষ-মাঘ এ দুই মাস শীতকাল হলেও চলতি বছরে শীতের ঠান্ডা বা শীতলতা পড়েছে পৌষের শুরুতেই।কথায় আছে এক মাঘে শীত যায়না অথচ মাঘ মাসে এখন আর শীত তেমন পড়ে না। এমনিতেই ঋতুচক্রে অন্য ৫টি ঋতু থেকে শীতকালের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুষ্ক চেহারা আর হিমশীতল অনুভব নিয়ে আসে শীত। সকাল ও সন্ধ্যা যেন নবীনগরের প্রকৃতি শীতের চাদর মুড়ি দেয়। বিশেষ করে ভোরবেলা ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা থাকে। হিমেল হাওয়ায় হাড় কাঁপিয়ে শীত জেঁকে বসে। শীতের দাপটে প্রকৃতি নীরব হয়ে গিয়েছে নবীনগরে। সবুজ প্রকৃতি রুক্ষ মূর্তি ধারণ করতে শুরু করেছে । শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ গাছপালার পাতা ঝরে পড়ার উপক্রম শুরু হয়েছে । শীত তার চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে প্রকৃতির ওপর জেঁকে বসেছে। রুক্ষতা, তিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি হয়ে শীত দাঁড়িয়ে রয়েছে । শীতের তান্ডবে প্রকৃতি বিবর্ণ হয়ে পড়েছে।
কখনো কখনো কুয়াশার স্তর এত ঘন থাকে যে, দেখলে মনে হয়, সামনে কুয়াশার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে নবীনগরের নৌপথে ও সড়কপথে লোকজন চলাচল করতে পারছে না জনগন। অনেক দেরিতে ওঠে সূর্য। প্রকৃতির ওপর সূর্যের নির্মল আলো ছড়িয়ে পড়ে। দেখে মনে হয়, সূর্যের আলোতে কোনো তেজ নেই। শিশু বাচ্চাদের কাপড় চোপড় শুকাতেও পারছে না ভালো করে গভীর রাত থেকে গাছের পাতায় শিশির বিন্দু জমতে থাকে। আর ভোররাতে শিশিরকণা বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে। টিনের চালে, ঘরের চালে, পাতার ওপর টুপটাপ বৃদ্ধির মতো পড়তে থাকে। ইতিমধ্যে নবীনগরের পূর্বাঞ্চল দক্ষিণাঞ্চলের গ্রাম গুলোতে জমিতে ধান কাটা শুরু হয়ছে। বাতাসে নতুন ধানের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতে এ এক সময় নবীনগরের প্রতিটি গ্রামের সবখানে নবান্ন উৎসবের রীতি থাকলেও এখন আর তেমন কোন অনুষ্ঠান চোখে পড়ে না ।শীতের কারণে সূর্যের তাপ কমে যাওয়ায় ভালো করে ধান শুকনো যাচ্ছে না। শীতের সকালে নবীনগরের টিয়ারা, মালাই ও কালঘরার খেজুরের মিষ্টি রস সবার মন কাড়ে। গাছিরা কলস ভরে রস নিয়ে আসে। খেজুরের কাঁচা রস রোদে বসে খাওয়াটাই যেন একটা আলাদা স্বাদ। শীতের দাপট এতো বেশি যে কিশোর ও তরুনরা বিগত বছরের ন্যায় এবার আর শীতের সকালে খেজুরের রস খাওয়ার সাহস করেতে পারছে না।
শীতকালে পাকা ধানের সোনালি খেতের দৃশ্য দেখে চোখ ফেরানো যায় না।নবীনগরে এখন পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরপরই কৃষকরা আবার বোরো আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তবে ঠান্ডার কারণে কাজ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
শীতের দীর্ঘ রজনী কম্বল-লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে রাত কাটছে তবে নবীনগর শহরেও কিছু ছিন্নমূল ও মানসিক বিকারাগ্রস্ত লোকদের শীতে গরম কাপড়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।সকালে উঠে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় সবাই উসখুস করতে থাকে। এ সময় শীতের দাপট থেকে বাঁচতে উচ্চবিত্তরা জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার এবং কোটসহ রং-বেরঙের বাহারি শীতবস্ত্র পরিধান করতে পারলেও নিম্নবিত্তরা তা পারে না। শীতে প্রকৃতি যেন ঝিমিয়ে পড়ে। শীতের শুষ্কতায় প্রকৃতি বিবর্ণ-রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। হাড় কাঁপানো শীতের দাপটে অনেক অস্বস্তিকর অনুভূতির মধ্যে একটি হলো ঠোঁট ও পা ফেটে যাওয়া।
শীতের সকালে বিশেষ করে তিতাস ও মেঘনার তীরবর্তী গ্রামে কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শীতকালে মাঝে মাঝে শুরু হয় শৈত্যপ্রবাহ। আর এ সময় তাপমাত্রা খুব নিচে নেমে যায়। নবীনগরের গ্রামগুলোতে হাড় কাঁপানো শীতে মানুষ-জীবজন্তুর পাশাপাশি প্রকৃতি যেন অসাড় হয়ে পড়েছে। নবীনগর উপজেলা সদর, ইউনিয়ন বাজার ও ফুটপাতে শীতবস্ত্র কেনার ধুম পড়েছে।যে যার সাধ্যমতো গরম কাপড় কিনে নিজেকে শীত থেকে সুরক্ষার চেষ্টা করছেন। শীতের সকাল ও রাতে ছিন্নমূল মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালায়। শীতের সকালে শহর-গ্রামে আগুনের কুন্ডলী তৈরি করে উত্তাপ নিতে দেখা যায় শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষকে। এই আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়ার মধ্যে রয়েছে আলাদা এক অনুভূতি। ভবঘুরেরা হাট-বাজার, স্কুল-কলেজের বারান্দায় আশ্রয় খোঁজে। কিছু সময় সরকার, দানশীল ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংগঠন দুস্থ-গরিবদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করতে দেখা গেছে।
তবে শীতকালে নবীনগরে চুরির ঘটনাও বৃদ্ধি পায়।
শীতের কনকনে ঠান্ডায় বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ সময় নবীনগর সরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোতে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে ।
নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন,”শীতকালে বাচ্চা ও বয়স্কদের সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, জ্বর ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় এজন্য গরম ও আরামদায়ক পোশাক পরানোর পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন,পর্যাপ্ত পানি পান করান ঠান্ডা ও ধুলাবালি এড়িয়ে চলেন ,ভোর ও গভীর রাতে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।